সিলসিলা ছহীহা বইয়ে তিনি প্রত্যেকটি হাদীছের বিভিন্ন সনদ উল্লেখপূর্বক তার বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং মুহাদ্দিছীনে কেরামের মানহাজের আলোকে হাদীছের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। এর মাধ্যমে তাহকীকের ক্ষেত্রে তার সূক্ষ্মদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেইসাথে বিভিন্ন স্থানে তিনি হাদীছ থেকে নিঃসৃত মণি-মুক্তাতুল্য মাসআলা ও ফায়েদার কথা উল্লেখ করেছেন। যা তার ফিকহী দক্ষতার জাজ্বল্য প্রমাণ।
আমরা বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষের নিকট হাদীছে নববীর সেই মণি-মুক্তা উন্মুক্ত করতে চেয়েছি। রাসুল (ছঃ) এর বিশুদ্ধ হাদীছের এই ভাণ্ডার অবশ্যই প্রতিটি তৃষ্ণার্ত মুমিন হৃদয়ের ইলমী পিপাসা মিটাবে। হাদীছের প্রতি ভালোবাসা থেকে শুরু হবে সুন্নাতের অনুসরণ। পথহারা মানুষ খুঁজে পাবে ছিরাতে মুস্তাকীমের দিশা। জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে এগিয়ে যাবে জামাতের স্থায়ী ঠিকানার দিকে। এটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পরম চাওয়া।
শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহ
সালফে সালেহীনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, মুহাদ্দিস, ফকীহ, দাঈ, ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহ এর সাথে পরিচিত হই। শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহ আধুনিক যুগে মুসলিম জাহানের একজন স্বনামধন্য আলেম। আধুনিক বিশ্বে শাইখ আলবানীকে ইলমে হাদীসের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইলমুল জারহে ওয়াত তাদীলের[1] ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রতিভাধারী আলেম হিসেবে গণ্য করা হয়। ইলমে মুস্তালাহুল হাদীসের[2] ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বক্তিত্ব। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন: “তিনি যেন ইবনে হাজার আসকালানী, হাফেয ইবনে কাসীর প্রমুখ ইলমুল জারহে ওয়াত তাদীলের আলেমদের যুগকে আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) ও ইসলামী গবেষক আল্লামা মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর বর্ণাঢ্য জীবনের মূল অংশগুলো নিচে দেওয়া হলো
- জন্ম ও হিজরত: তিনি ১৯১৪ সালে ইউরোপের আলবেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। আলবেনিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ও পর্দাপ্রথা নিষিদ্ধ হলে তাঁর পিতা সপরিবারে সিরিয়ার দামেস্কে হিজরত করেন।
- শিক্ষাজীবন ও পেশা: প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার বদলে তিনি তাঁর আলেম পিতার কাছেই কুরআন, তাজবীদ ও হানাফী ফিকহ শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি দামেস্কের অন্যান্য আলেমদের দরসেও অংশ নিতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ঘড়ি মেরামতের পেশা বেছে নেন, যা তাঁকে স্বাধীনভাবে পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় এনে দেয়।
- হাদিস গবেষণা: মাত্র ২০ বছর বয়সে 'আল মানার' পত্রিকার একটি প্রবন্ধ পড়ে তিনি হাদিস গবেষণায় প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন। তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্যের কারণে দামেস্কের বিখ্যাত 'জাহেরিয়া লাইব্রেরী' কর্তৃপক্ষ তাঁর গবেষণার জন্য একটি বিশেষ কক্ষ ও চাবি বরাদ্দ করেছিল।
- দাওয়াত ও কারাবরণ: কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের আদর্শের দিকে দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি সমসাময়িক কিছু আলেম ও বিদআতীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। রাজনৈতিক কারণে সিরিয়া সরকার তাঁকে দু'বার কারাবন্দী করে। পরবর্তীতে তিনি সিরিয়া ছেড়ে জর্দানের আম্মানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
- অসামান্য অবদান: সারাজীবনে তিনি শতাধিক অমূল্য গ্রন্থ রচনা ও তাহকিক (গবেষণা) করেছেন। এর মধ্যে 'সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহীহাহ', 'সিলসিলাতুল আহাদিসিয যয়ীফাহ', এবং 'সিফাতু সালাতিন নাবী (সা.)' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইলমে হাদিসের অনন্য খেদমতের জন্য ১৯৯৯ সালে তাঁকে 'আন্তর্জাতিক বাদশাহ ফায়সাল পুরস্কার' প্রদান করা হয়।আলেমদের মূল্যায়ন: শাইখ বিন বায (রহ.) এবং শাইখ উসাইমীন (রহ.)-এর মতো সমসাময়িক শীর্ষ আলেমরা তাঁকে এ যুগের 'মুজাদ্দিদ' (সংস্কারক) এবং শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- অন্তিম ওসিয়ত ও মৃত্যু: তিনি তাঁর সারা জীবনের সংগৃহীত বিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরীটি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াকফ করে যান। সহজ ও দ্রুত দাফনের ওসিয়ত করে ১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবর জর্দানে তিনি ইন্তেকাল করেন।
প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে একজন সাধারণ ঘড়ির কারিগর থেকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে পরিণত হওয়ার এই ইতিহাস যেকোনো জ্ঞানপিপাসুর জন্যই এক বিরাট অনুপ্রেরণা।
মাকতাবাতুস সালাফ
**মাকতাবাতুস সালাফ** বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত ইসলামি প্রকাশনা সংস্থা, যা মূলত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা ও মানহাজের আলোকে বিশুদ্ধ ইসলামি জ্ঞান প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে থাকে। প্রকাশনাটি কুরআন ও সুন্নাহর দলিলভিত্তিক বইপত্র প্রকাশের জন্য পাঠকদের কাছে সমাদৃত এবং তারা সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পথের ওপর রচিত তাফসির, হাদিস, আকিদা, ফিকহ এবং আত্মশুদ্ধিমূলক বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। পাঠকদের কাছে নির্ভুল ও মানসম্মত ইসলামি সাহিত্য পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করা মাকতাবাতুস সালাফ বর্তমানে ইসলামি বইয়ের জগতে এক নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।করেছে।