20% ছাড়
ইসলাম আগমনের পূর্বে নারীর কোন মানমর্যাদা ও কদর ছিল না। যেটুকু ছিল, সেটুকু শুধু যৌনসুখের আশায় 'ওয়াইফ ইজ লাইফ' আকারে। কন্যা হিসাবে নারীর মান ছিল না। এই জন্য কোন দম্পতিই কন্যা সন্তান পছন্দ করত না। কারো কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে শুনলেই তার চেহারা কালো হয়ে যেত। মহান আল্লাহ সেই জাহেলী যুগের মানুষদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِمَا ضَرَبَ لِلرَّحْمَنِ مَثَلًا ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ عظیم
অর্থাৎ, ওরা পরম দয়াময় আল্লাহর প্রতি যে কন্যা সন্তান আরোপ করে, ওদের কাউকেও সে কন্যা সন্তানের সংবাদ দেওয়া হলে তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।'
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ (٥٨) يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيْمْسِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاء مَا يَحْكُمُونَ)
অর্থাৎ, তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কাল হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট।'
১. সূরা যুখরুফ-৪৩:১৭।
২. সূরা নাহল-১৬:৫৮-৫৯।
বরং তারা মাটিতে জীবন্ত দাফন করে দিত! মহান আল্লাহ সে কথাও বলেছেন এবং তাদের সে নির্মম পাপের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তাও জানিয়ে দিয়েছেন।
وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَت - بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ)
অর্থাৎ, যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
যেমন বর্তমানেও যন্ত্রের মাধ্যমে কন্যা ভ্রূণ চিহ্নিত করে গর্ভেই তা হত্যা করা হচ্ছে।
সে যুগে কন্যা সন্তানকে ন্যায্য অধিকার ও মীরাসের অংশ থেকে বঞ্চিত করা হত। বর্তমান জাহেলী যুগেও কন্যাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। পণ ও যৌতুক প্রথার কারণে পিতা-মাতার কাছে কন্যা সন্তান আদৌ বাঞ্ছিত নয়। বড় হয়ে অনেক কন্যা পিতা-মাতার মান সম্মান রাখে না বলেও কন্যা সন্তানের প্রতি অনীহা আসে। পুত্র-সন্তানে মানহানিকর কিছু ঘটালে সমাজে ক্ষতিকর নয় বলেই সবাই পুত্র-সন্তান চায়। সমাজে সেই ছেলেকে পছন্দ করা হয়, যার ভবিষ্যৎ আছে। আর সেই মেয়েকে পছন্দ করা হয়, যার অতীত আছে। অতীত হারানো মেয়ে পতিতার মতো বলেই তার কদর বিলুপ্ত হয়।
বর্তমান যুগের কন্যার অবস্থা সম্বন্ধে এক কবি বলেছেন,
'কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়, রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।'
জাহেলী যুগে তার অবস্থা এর চাইতেও ঢের শোচনীয় ছিল।
কিন্তু ইসলাম এসে নারীকে মর্যাদা দিল। মুহাম্মাদ যখন নবী হয়ে প্রেরিত হলেন, তখন তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখালেন।
৩. সূরা তাকভীর-৮১:৮-৯।
অজ্ঞতার সিন্ধু থেকে তুলে জ্ঞানের সৈকত দেখালেন। ভ্রষ্টতার কদর্যতা থেকে উদ্ধার করে সৎপথের সুন্দর পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করলেন। নারীকে তার যথার্থ মর্যাদা দিলেন। তার প্রাপ্য অধিকার তাকে প্রদান করলেন। মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনরূপে যথাযথ সম্মান দান করলেন। তিনি বললেন,
إنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ: اليَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ»
'হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বল; ইয়াতিম ও নারীর অধিকার লংঘনে পাপের কথা ঘোষণা করছি।
مَنِ ابْتُلِيَ مِنْ هَذِهِ البَنَاتِ بِشَيْءٍ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ»
'যে ব্যক্তি একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।'
বর্তমান জাহেলী যুগেও বহু মানুষের কাছে নারীর মর্যাদা নেই। তাদের সমাজে নারী বিকিকিনি হয়। যৌন বিলাসের জন্য ভোগ্য পণ্যের মতো নারীর সস্তা বাজার রমরমা। বৃদ্ধা হয়ে গেলে নারীর স্থান হয় বৃদ্ধ খোঁয়াড়ে (বৃদ্ধাশ্রমে)।
এ হল পাশ্চাত্যের অবস্থা এবং তার পাচাঁটা গোলামদের সমাজ ব্যবস্থা। 'নারী স্বাধীনতা'র নামে তারা 'যৌন স্বাধীনতা' দিয়ে নারীকে নিজেদের যৌন খোঁয়াড়ে বন্দী করেছে। তবুও তাদের গর্ব কত, তারা দিয়েছে, নারীর মর্যাদা!
সেই গর্বে শরীক হয়েছে মুসলিম নামধারী বহু মুনাফিক মানুষ। যারা পাশ্চাত্যের সেই যৌনস্বাধীনতা নিজেদের সমাজ ও পরিবেশে দেখতে চায়। সুতরাং তারা প্রচার মাধ্যমে তা প্রচার করে, পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করে, অনেকে আবার এ ব্যাপারে পৃথক বই পুস্তকও লেখে। অনেকে পাশ্চাত্যের নুন খেয়ে তাদের ভালমতো গুণ গায়। ফলে সেই যৌনস্বাধীনতার চিন্তাধারা
৪. আহমাদ ৯৬৬৬, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ৩৬৭৮, ইবনে হিব্বান ১২৬৬, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০১৫।
৫. বুখারী ১৪১৮, মুসলিম ২৬২৯।
মুসলিম উম্মাহর মাঝে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যেমন শুষ্ক কাশফুলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
এই আগুনের লেলিহান শিখার মুখে পড়েও অনেক মুসলিমের অবস্থা 'পিপু ফিশু'র মতো পিঠ পুড়ে গেল। ফিরে শোও। কত রবি জ্বলে? কেবা আঁখি মেলে?
আর অনেকের অবস্থা সেই বরাঙ্গীর মতো, যাকে বলা হল, 'বরাঙ্গী লো বরাঙ্গী! তোর ঘর পুড়ছে যে!' সে বলল, 'পুডুক্সে, আমার বরাং তো পুড়েনি!'
অনেকে বলে, 'অত কি মানা যায়?'
অনেকে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করে।
অনেকের চিরাগ তলে অন্ধকার!
অনেকে মাথার টুপি ঠিক রেখে চলে, কিন্তু বউয়ের মাথায় কাপড়ের কথা খেয়াল করে না।
বিদেশী আগ্রাসনের পর থেকে পাশ্চাত্যের পরশ পর্দার পরিবেশকে 'কদর্য' পরিগণিত করেছে। পুরুষমহলে চাকরির লোভ মহিলাদেরকে পর্দা অবজ্ঞা করতে বাধ্য করছে। যৌথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভিন্ন যৌবনারা পর্দার পর্দাকে মন থেকে ছিন্ন করে ফেলছে। নারীবাদী লেখক লেখিকারা নারী স্বাধীনতার নামে জরায়ু স্বাধীনতার প্রচার ও প্রসারে পর্দার নিন্দা করে চলেছেন। কবি-সাহিত্যিকরাও পাশ্চাত্যের তথাকথিত সভ্যতায় প্রভাবান্বিত হয়ে সেই একই বিষ উদ্গার করে চলেছেন। নারীকে সমানাধিকার প্রদান করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরি স্থল ও হাটে-বাজারে উপস্থিত করছেন দেশের নেতা-নেত্রীরা।
মুসলিম দেশগুলিতে পর্দা অবমানিত শুরু হয়। ১৯২০ সালে মুসলিম নামধারী নাস্তিক আতান তুর্ক কামাল পাশা তুর্কিস্তানে পর্দা নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করে। ১৯২৬ সালে রাফেযী রিযা পাহলবী ইরানে পর্দা নিষিদ্ধ হওয়ার আইন পাশ করে। আফগানিস্তানে মুহাম্মাদ আমান পর্দা উচ্ছেদ করার নিয়ম (কানুন) চালু করে। আলবেনিয়ায় আহমাদ যোগোয়া রেওয়াজ তুলে দেয়। তিউনিসিয়ায় ১৪২১ হিজরী মুতাবিক ২০০০ সনে কুখ্যাত নেতা বুরুক্বাইবা আইন করে পর্দা নিষিদ্ধ করে।
আজ এই ২০১১ সালেও ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু দেশে পর্দা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। উপমহাদেশে তারই অনুকরণ করার চেষ্টা চলছে। কোথাও পর্দার বিরুদ্ধে পুরুষেরা সোচ্চার হচ্ছে!
'মাছ মরেছে বিড়াল কাঁদে শান্ত করল বকে, ব্যাঙের শোকে সাঁতার পানি দেখি সাপের চোখে!'
কোথাও পর্দার বিরুদ্ধে মিটিং মিছিল হচ্ছে। কোথাও বোরকা জ্বালানো হচ্ছে।
যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না, তাদের কথাই আলাদা। তাদের সাথে যুক্তি তর্কে পেরে ওঠা যাবে না। যেহেতু তাদের মধ্যে আসল শর্ত (ঈমান বিল্লাহ) টাই নেই। এ পুস্তিকা তাদের জন্য নয়, কুরআনও তাদের জন্য হিদায়াত নয়। মহান আল্লাহ সেই শিক্ষা গর্বিত অহংকারীদেরকে পথ দেখাবেন না। তিনি বলেছেন,
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِن يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلاً وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيْلاً ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ)
অর্থাৎ, পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে গর্ব করে বেড়ায় তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী হতে ফিরিয়ে দেব; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও ওতে বিশ্বাস করবে না। তারা সৎপথ দেখলেও তাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তাকেই পথ হিসাবে গ্রহণ করবে। এটি এ কারণে যে, তারা আমার আয়াত (নিদর্শন) সমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা উদাসীন ছিল।
৬. সূরা আরাফ-৭:১৪৬।
পক্ষান্তরে যাদের বুকে এখনও ঈমানের পিদিম জ্বলছে, তাদের সতর্কতার জন্য হিজাবের বহু বই মন্থন করে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। মহান আল্লাহ বলেন,
وَذَكِّرُ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ)
অর্থাৎ, তুমি উপদেশ দিতে থাক, কারণ উপদেশ বিশ্বাসীদের উপকারে আসবে।' তাঁর কাছেই আমার আশা, তিনি যেন পাঠক পাঠিকার মন থেকে মুনাফিক্বী, সন্দেহ, গাফিলতি, উন্নাসিকতা ও অবহেলার পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাঁদের পরিবারে পর্দার বিধান প্রতিষ্ঠা করে দেন। আমীন।
প্রকাশনীর বিস্তারিত পরিচিতি পাওয়া যায়নি।