20% ছাড়
ছালাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের অবস্থান
ইসলামে ছালাত পরিত্যাগকারীর কোন অবস্থাননেই: যে সকল আমলের মাধ্যমে মানুষের ঈমান টিকে থাকে তার মধ্যে সর্বাধিক বড় মাধ্যম হ’ল ছালাত। কেউ ছালাত ত্যাগ করলে ইসলামে কোন অংশ থাকবে না বলে ছাহাবায়ে কেরাম সতর্ক করে দিয়েছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় থাকাকালীন ছালাতের কথা বলা হ’লে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন,إِنَّهُ لَا حَظَّ لِأَحَدٍ فِي الْإِسْلَامِ لِمَنْ أَضَاعَ الصَّلَاةَ، فَصَلَّى وَجُرْحُهُ يَثْعَبُ دَمًا، ‘নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির ইসলামে কোন অবস্থান নেই, যে ছালাত বিনষ্ট করে। অতঃপর ওমর (রাঃ) ছালাত পড়লেন অথচ তার জখম হ’তে তখনও রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল’।[1]
ছালাত ত্যাগকারী ঈমানহীন মানুষ : ছালাতহীন মানুষ ঈমানহীন মানুষের মত। কেউ ছালাত পরিত্যাগ করলে তার ঈমান থাকবে না। এজন্য ছালাত ত্যাগ করা যাবে না। যেমন আছারে এসেছে,وَعَنْ أبِيْ الدَّرْداَءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قال: لاَ إيْماَنَ لِمَنْ لاَ صَلَاةَ لَهُ وَلَا صَلَاةَ لِمَنْ لَا وُضُوْءَ لَهُ، আবু দ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত পড়ে না তার ঈমান নেই। আর যে ব্যক্তি ওযূ করেনি তার ছালাত হবে না’।[2] عَن ابنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنهُ قَالَ مَن تَرَكَ الصَّلاَةَ فَلاَ دِينَ لَه، ইবনে মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত ত্যাগ করে, তার দ্বীনই নেই’।[3]
মুছ‘আব বিন সা‘দ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বললাম, হে পিতা! আল্লাহ বলেন,الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ ‘যারা তাদের ছালাত থেকে উদাসীন’ (মা‘ঊন ১০৭/৫)। এই আয়াত সম্পর্কে আপনি কি বলেন? আমাদের মধ্যে কে এমন আছে যার ছালাতে উদাসীনতা আসে না? কে এমন আছে ছালাত পড়তে গিয়ে যার মনে বিভিন্ন কথা স্মরণ হয় না? তিনি বললেন, لَيْسَ ذَلِكَ إِنَّمَا هُوَ إِضَاعَةُ الْوَقْتِ يَلْهُو حَتَّى يَضِيعَ الْوَقْتُ বিষয়টা এরকম নয়। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছালাত নষ্ট করা। যারা আজে-বাজে (দুনিয়াবী) কাজে লিপ্ত থেকে ছালাতের সময়কে নষ্ট করে দিবে’।[4]
জাবের বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হ’ল-مَا كَانَ يُفَرِّقُ بَيْنَ الْكُفْرِ وَالْإِيْمَانِ عِنْدَكُمْ مِنَ الْأَعْمَالِ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ، ‘রাসূল (ছাঃ)-এর আমলে আমলসমূহের মধ্যে কোন আমলটি আপনাদের নিকট ঈমান এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী হিসাবে বিবেচিত হ’ত? তিনি বললেন, ছালাত’।[5]
عَنْ زَيْدِ بْنِ وَهْبٍ، قَالَ: دَخَلْتُ مَعَ حُذَيْفَةَ الْمَسْجِدَ فَرَأَى رَجُلًا يُصَلِّي لَا يُتِمُّ رُكُوْعَهُ وَلَا سُجُوْدَهُ فَقَالَ لَهُ حُذَيْفَةُ: مُنْذُ كَمْ صَلَّيْتَ؟ قَالَ: مُنْ أَرْبَعِينَ سَنَةً، فَقَالَ لَهُ حُذَيْفَةُ: مَا صَلَّيْتَ وَلَوْ مُتَّ مُتَّ عَلَى غَيْرِ الْفِطْرَةِ الَّتِي فَطَرَ اللهُ عَلَيْهَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،
যায়েদ বিন ওয়াহাব হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা আমি হুযায়ফা (রাঃ)-এর সাথে মসজিদে প্রবেশ করলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার রুকূ‘-সিজদা পূর্ণ করছে না। সে ছালাত শেষ করলে তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি কতদিন থেকে এভাবে ছালাত আদায় কর? লোকটি বলল, চল্লিশ বছর। হুযায়ফা (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি ছালাত আদায় করনি। শাক্বীক্ব বলেন, আমার মনে হয় হুযায়ফা এ কথাও বলেছেন, যদি তুমি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর, তাহ’লে নবী করীম (ছাঃ)-কে যে প্রকৃতির উপর আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন, তুমি তার বাইরে মৃত্যুবরণ করবে’।[6]
অনুরূপ বর্ণনা রাসূল (ছাঃ) থেকেও এসেছে। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلًا لَا يُتِمَّ رُكُوعَهُ يَنْقُرُ فِيْ سُجُودِهِ وَهُوَ يُصَلِّي، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ مَاتَ هَذَا عَلَى حَالِهِ هَذِهِ مَاتَ عَلَى غَيْرِ مِلَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَثَلُ الَّذِي لَا يُتِمُّ رُكُوعَهُ ويَنْقُرُ فِي سُجُودِهِ، مَثَلُ الْجَائِعِ يَأْكُلُ التَّمْرَةَ وَالتَّمْرَتَانِ لَا يُغْنِيَانِ عَنْهُ شَيْئًا- ‘একদা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার ছালাতে পূর্ণভাবে রুকূ‘ করছে না এবং ঠকঠক করে (তাড়াতাড়ি) সিজদা করছে। এ দেখে তিনি বললেন, এ ব্যক্তি যদি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহ’লে তার মরণ মুহাম্মাদী মিল্লাতের উপর হবে না। অতঃপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার রুকূ‘ সম্পূর্ণরূপে করে না এবং ঠকাঠক (তাড়াহুড়া করে) সিজদা করে তার উদাহরণ সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত, যে একটি অথবা দু’টি খেজুর তো খায় অথচ তা তাকে মোটেই পরিতৃপ্ত করে না’।[7] বিলাল (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি একদা দেখলেন একজন লোক রুকূ‘-সিজদা পরিপূর্ণরূপে করছে না। তখন তিনি বললেন, এ লোক (এ অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করলে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ধর্মের বাইরে মৃত্যুবরণ করবে।[8] ছালাত আদায় করার পরেও যখন ত্রুটি হওয়ার কারণে মিল্লাতে মুহাম্মাদীর উপর টিকে থাকা যাচ্ছে না সেখানে ছালাত পরিত্যাগকারীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে তা সহজে বুঝা যায়।
ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ বলেন,قَدْ صَحَّ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ تَارِكَ الصَّلَاةِ كَافِرٌ، وَكَذَلِكَ كَانَ رَأْيُ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ لَدُنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى يَوْمِنَا هَذَا أَنَّ تَارِكَ الصَّلَاةِ عَمْدًا مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ حَتَّى يَذْهَبَ وَقْتُهَا كَافِرٌ، ‘রাসুল (ছাঃ) থেকে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত, ছালাত পরিত্যাগকারী কাফের। অনুরূপভাবে নবী করীম (ছাঃ) থেকে আমাদের সময় পর্যন্ত বিদ্বানগণের অভিমত হ’ল, বিনা কারণে ইচ্ছাকৃত -ভাবে ওয়াক্তের শেষ সীমাতেও ছালাত বর্জনকারী কাফের।[9] ইবনু হাযম (রহঃ) বলেন,وَقَدْ جَاءَ عَنْ عُمَرَ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ وَغَيْرِهِمْ مِنْ الصَّحَابَةِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ أَنَّ مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ فَرْضٍ وَاحِدَةٍ مُتَعَمِّدًا حَتَّى يَخْرُجَ وَقْتُهَا فَهُوَ كَافِرٌ مُرْتَدٌّ. ‘ছাহাবীদের মধ্যে ওমর, আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, মু‘আয বিন জাবাল ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত একটি ফরয ছালাত পরিত্যাগ করবে এমতাবস্থায় যে, ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়ে গেল তাহ’লে সে কাফের মুরতাদ’।[10]
হাসান বছরী (রহঃ) বলেন,بَلَغَنِي أَنَّ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانُوا يَقُولُونَ: بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ أَنْ يُشْرِكَ فَيَكْفُرَ أَنْ يَدَعَ الصَّلَاةَ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ ‘আমার নিকট এ মর্মে খবর পৌঁছেছে যে, রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীরা বলতেন, বান্দা এবং শিরককারীর মধ্যে পার্থক্য হ’ল এই যে, সে বিনা ওযরে ছালাত পরিত্যাগ করল’।[11]
সূরা মা‘আরিজ ২৩ আয়াতের তাফসীরে ইমাম কাতাদা (রহঃ) বলেন,ذُكِرَ لَنَا أَنَّ دَانْيَالَ نَعَتَ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يُصَلُّونَ صَلَاةً لَوْ صَلَّاهَا قَوْمُ نُوحٍ مَا أُغْرِقُوا، وَعَادٌ مَا أُرْسِلَتْ عَلَيْهِمُ الرِّيحُ، وَثَمُودٌ مَا أَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ، فَعَلَيْكُمْ بِالصَّلَاةِ فَإِنَّهَا خُلُقٌ لِلْمُؤْمِنِينَ حَسَنٌ، ‘দানিয়াল (আঃ) উম্মতে মুহাম্মাদী (ছাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, তারা ছালাত আদায় করে। যদি নূহের সম্প্রদায় ছালাত আদায় করত তাহ’লে তারা ডুবে মরত না। আ‘দ সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদের প্রতি ঝড়-তুফান পাঠিয়ে ধ্বংস করা হ’ত না। ছামূদ সম্প্রদায় ছালাত আদায় করলে তাদেরকে গর্জন-ভূমিকম্প পাকড়াও করত না। অতএব তোমাদের জন্য ছালাত আদায় করা আবশ্যক। কারণ এটি মুমিনদের জন্য সুন্দর চরিত্রের অংশ’।[12]
লেখকের বিস্তারিত পরিচিতি পাওয়া যায়নি।
প্রকাশনীর বিস্তারিত পরিচিতি পাওয়া যায়নি।